মায়ের জন্য ভালোবাসা

হারস্টোরি ফাউন্ডেশনে আমরা বাংলাদেশের দুঃসাহসী সব সুপারগার্লের গল্প বলি। সেখানে খনা থেকে শুরু করে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, শহীদজননী জাহানারা ইমাম কিংবা ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তারদের সাফল্যের গল্প থাকে, যা থেকে পাওয়া যায় অনুপ্রেরণা। কিন্তু আমাদের চারপাশে তাকালেই আমরা অসংখ্য সুপারগার্ল দেখি প্রতিনিয়ত। যাদের কথা বলা হয় না আয়োজন করে। তাই আজ বলছি আমার একান্ত নিজস্ব সুপারগার্লকে নিয়ে।

পারভীন মাহমুদ, আমার মা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস বাংলাদেশের (আইসিএবি) প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ১৭ বছর বয়সে একটি রক্ষণশীল যৌথ পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়। দুই ছেলেমেয়ে হওয়ার পর পাঁচ বছরের বিরতি দিয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেন। মায়ের কাছে আমরা দুই ভাইবোন শিখেছি কীভাবে পরিবারে সুষ্ঠু সময় দিয়ে, নিজের পেশাজীবনের শিখরে পৌঁছানো যায়। শুধু তা–ই না, মায়ের কাজের মধ্য দিয়ে আমরা এখনো প্রতিনিয়ত শিখছি কীভাবে একজন বড় মাপের মানুষ হওয়া যায়। এসবের জন্য লাগে অধ্যবসায়, কঠোর শ্রম, সময় ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা।

স্কুলে পড়ার সময় মা আমাকে গুণগত সময় (কোয়ালিটি টাইম) দিতেন। আমি বেশ দায়িত্বশীল ছিলাম, তাই সব সময় পড়াতেন না। সাহায্য করতেন সংকটময় মুহূর্তগুলোয়। যেমন ভর্তি পরীক্ষা এবং ফাইনালের সময়। ও লেভেল পরীক্ষার আগের দিন মা মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমাকে বললেন, ‘ঘুমাতে যাও, আগামীকালের পরীক্ষাটি জীবনের শেষ নয়।’ প্রতিটি পদক্ষেপকে জীবন–মরণ লড়াই হিসেবে না দেখার এ শিক্ষা ১৬ বছর বয়সে পেয়েছি, কিন্তু আজীবন কাজে লাগছে। এভাবে এমন এক স্বাধীনতা তিনি দিয়েছিলেন, যা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। এটি আমার জীবনের বড় পাওয়া। মায়ের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ডায়েরি এবং কবিতায় ভরা নোটবুক থেকেও শিখেছি অনেক কিছু।

মাকে দেখেই শিখেছি কীভাবে সবার সঙ্গে নিজের আনন্দ ভাগ করে নিতে এবং দুঃখের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। সন্তান, স্বামী, পরিবার, বন্ধু, গৃহকর্মী ও সহকর্মী—সবার প্রতিই তাঁর সহানুভূতিশীল আচরণ ছিল সব সময়। ছোটবেলায় দেখেছি আমার বাবাকে যিনি মানুষ করেছেন, মা তাঁকে আজীবন পেনশন দিয়ে গেছেন। প্রতিনিয়ত তিনি তাঁর পরিচিতদের চাকরি পেতে সাহায্য করেন এবং নিয়মিত মেন্টরিং করেন।

অ্যাকাউন্টিং ফার্ম শুরু করার পর, আমি অনুভব করি বেশির ভাগ মেয়েরই পেশায় অনেক বাধা থাকে। সে সময় বিভিন্ন পেশাজীবী নারী রোল মডেলদের একত্র করতে চেয়েছিলাম, যাতে তাঁদের গল্প শুনে অন্যরা এগোতে পারে। কাজটা সহজ ছিল না এবং পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য আমাকে অনুৎসাহিত করেছিল। শুধু মা বলেছিলেন, ‘খুব ভালো আইডিয়া, শুরু করো, স্বপ্ন দেখলে স্বপ্ন একসময় পূরণ হয়।’ সেখান থেকেই হারস্টোরি ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু। আমি নিজে একজন মা। আমার ছেলের বয়স এখন ছয় বছর। আমার আশা আমাদের পৃথিবীতে প্রতিদিনই হবে মা দিবস। আর মা দিবসের এই বিশেষ আয়োজনে আমার মাকে জানাই ভালোবাসা, সাহসী হতে আর স্বপ্ন দেখতে শেখানোর জন্য।

লেখক: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং হারস্টোরি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *