শিকাগো বিমানবন্দর ‘ওহারে’

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল–কায়েদা জঙ্গিদের চারটি বিমান ছিনতাইয়ের পর থেকেই এয়ার ট্রান্সপোর্টেশনের সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আমেরিকার প্রতিটি বিমানবন্দরেই নিরাপত্তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নজর বাড়িয়েছে। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও তাই বাড়ছে। বিমান থেকে নামার পরে প্রথম ধাপের চেকপয়েন্টে প্যাসেঞ্জার স্ক্রিনে হ্যান্ড লাগেজসহ যাত্রীদের আপাদমস্তক পরীক্ষা করা হলো। তারপর আবারও কম্পিউটারে স্ক্রিনিং হওয়ার পরেই গন্তব্যের পথে ছুটতে পারলেন সবাই। এয়ার ইন্ডিয়ার ডেপারচার গেটে পৌঁছাতে সুচরিতদের দশটা বেজে গেল। সিনসিনাটির সময় তখন সকাল এগারোটা। ভোর তিনটায় সিনসিনাটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছুটতে হয়েছিল। ওয়াশরুম থেকে ফিরে প্রথমেই তাই খাদ্যের অনুসন্ধানে ছুটতে হলো। এ দেশের বিমানবন্দরে ক্যাফে, বার, কফি শপ, রেস্টুরেন্ট, ছোটখাটো ফাস্ট ফুডের দোকানের জন্য বিশেষ বিশেষ স্থান নির্ধারিত থাকে। খানিকটা হাঁটার পরে চোখে পড়ল বাবলস্ ওয়াইন বার, শিকাগো কাবস বার অ্যান্ড গ্রিল, টরটাস ফ্রনটেরা, চিলস টু, গোল্ডকোষ্ট ডগস ইত্যাদি দোকানগুলো।

কিন্তু অভ্যস্ত জলখাবারের সঙ্গে এগুলোর কোনোটাই মেলে না। সুচরিত স্ত্রীর উদ্দেশে খানিকটা উষ্মা নিয়ে বলল, পথেঘাটে বেরোলে অত স্ট্রিক্ট থাকলে চলে? বহ্নি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল, ম্যাকডোনাল্ড হলেই তো খেতে পারতাম! এখানে গুচ্ছের দোকান দেখছি, কেবল সেটাই চোখে পড়ছে না। আছে কি না, তা–ই বা কে জানে! থাকা উচিত। চলো ওদিকটায় দেখে আসি। অনেকটা হাঁটতে হবে বহ্নি। অসুবিধে নেই। এরপর তো ১০–১২ ঘণ্টা প্লেনেই বসে থাকতে হবে।

বেশ ভিড় ম্যাকডোনাল্ডের সামনে। ইয়েলো, ব্ল্যাক, হোয়াইট, ব্রাউন সব রেশের সমাগম এখানে। কেননা, সব দেশের খাদ্যাভ্যাস এখানে মোটামুটি মিলে যায়। সুচরিতদের আইটেমে এল প্যান কেক, ম্যাপল সিরাপ, গ্রিল করা বাটারনাট স্কোয়াশ, স্ক্র্যামবলড এগ আর রেড আপেল। পানীয় হিসেবে চা এবং কফির পরিবর্তে পেপার গ্লাসে গরম জল। ন্যাপকিন আনতে গিয়ে সহসা বহ্নির চোখজোড়া আটকে গেল সাদাসিধে চেহারার এক জোড়া দম্পতির দিকে। লম্বা লাইনে দুজনেই দাঁড়িয়েছেন খাবার সংগ্রহ করতে। চোখাচোখি হতে ভদ্রলোক লাইন ছেড়ে দ্রুত সামনে এসে দাঁড়ালেন। ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, বাঙালি নাকি? হ্যাঁ। জবাব শুনে মুখের ওপর স্বস্তির হাসি ফুটল। স্পষ্ট বাংলায় বললেন, বাঁচা গেল! এখানে তো চেহারা দেখে কে বাঙালি আর কে নয়, বোঝাই মুশকিল। তবে আপনাকে দেখেই আমার স্ত্রী বললেন, গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেই দেখো না, বাঙালি কি না। বহ্নি হাসল, কোথায় যাচ্ছেন? দিল্লি হয়ে কলকাতা। আপনারা? দিল্লি হয়ে ভুবনেশ্বর। দেখেছেন? এই জন্যই ভগবান আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিলেন! অন্তত দিল্লি পর্যন্ত তো একসঙ্গে যাওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের একই ফ্লাইট না–ও হতে পারে।

বহ্নির ন্যাপকিন সংগ্রহ করা হলো না। ভদ্রলোক কথা বলতে শুরু করেছেন—আসলে এবারই আমাদের প্রথম এখানে আসা। ছেলে এসেছে পাঁচ বছর আগে। মিজৌরিতে থাকে। ওখানকার এক চিলড্রেন হসপিটালে চাকরি করে। বউমার বাচ্চা হবে, তাই মাস দুই আগে আসতে হয়েছিল। আমার স্ত্রীর পক্ষে একা একা আসা তো সম্ভব নয়, তাই সঙ্গে আসতে হলো। বউমার মা নেই। কিন্তু এখানে বাইরে একা একা চলাফেরা করায় আমরা অভ্যস্ত নই। সেই জন্যই…! সাহায্য দরকার? না সে রকম কিছু নয়। আসলে এখানে কী ধরনের খাবার পাওয়া যাবে, তাই নিয়েই…। আমার স্ত্রী আবার কোনো রকম মাংসটাংস খান না। তাই…! অসুবিধে নেই। এই ম্যাকডোনাল্ডে মাছ মাংস ছাড়াও অনেক আইটেম পেয়ে যাবেন। ওপরে লিস্ট টাঙানো আছে। সব লেখা রয়েছে সেখানে। পছন্দমতো বেছে নেবেন। সঙ্গে আসব? না ধন্যবাদ! ওই তো এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি।

বহ্নিদের খাওয়া শেষের পথে, এমন সময় খাবার নিয়ে বাঙালি দম্পতি এলেন। চারটে চেয়ারের দুটো তখনো শূন্য পড়ে ছিল। কয়েক মুহূর্তেই বোঝা গেল ভদ্রমহিলা যেমন কথা কম বলেন, ভদ্রলোক তেমনি বিস্তর। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও বাক্যালাপে জড়তা নেই। বললেন, এই তো দেখুন না, এত গরমেও স্যুটকেস থেকে বার করে ভারী দুখানা জ্যাকেট চাপাতে হলো গায়ে! ব্যাপারটা কী রকম বিশ্রী ভাবুন তো। কিন্তু কেন জানেন? মজা পেয়ে সুচরিত জানতে চাইল, কেন? স্রেফ ওজনের জন্য। চেক ইন ডেস্কে গিয়ে ওজন মাপা যন্ত্রে ধরা পড়ল, দুটো স্যুটকেসই খুব ভারী হয়ে গিয়েছে। তক্ষুনি তালা খুলিয়ে ওরা বললেন, বাড়তি জিনিস বের করে নিন। অতিরিক্ত ওজন নিলে টাকা দিতে হবে। বলেই ভদ্রলোক মুখে ভাজা জুকিনির টুকরো তুললেন। খাওয়া শেষ করে বললেন, ২০০ ডলার দিতে হবে, ভাবুন। কাল সন্ধ্যাবেলা ছেলে দোকানে গিয়ে সেলে জ্যাকেট দুটো কিনেছিল। স্যুটকেস থেকে বের করে নিলুম। শুধু শুধু অতগুলো টাকা কেন গচ্চা দিতে যাব? নিজের জিনিসই তো। সব একসঙ্গে পরে নিলেই হলো। যাক, তবে তো হয়েই গেল। কোথায় আর হলো দাদা? স্ত্রীকে বলেছিলাম, এসো দুজনে একখানা করে পরে নিই। বলল, পুরুষ মানুষের জিনিস কী বুদ্ধিতে পরব? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? কী আর করা। আমাকেই সবগুলো পরতে হলো। কিন্তু ওজন তো আর কম নয়। তার ওপর গরমের দিন। লোকেই বা ভাবছে কী? কিচ্ছু ভাবছে না। এখানে এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।

দশাসই চেহারার এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ এসে দাঁড়িয়েছে সামনের ডানকিন ডোনাটসের সামনে। ছয় ফুটের মতো দৈর্ঘ্য। দশাসই প্রস্থের বিশাল বপু। মাথার চুল এক শ খানিক বিনুনিতে স্কন্ধজুড়ে ঝুলে আছে। বিনুনির অর্ধেকটা অংশ সাদা আর গোলাপি রঙে চিত্রিত। সামনেরটা অমাবস্যার অন্ধকারের মতো কালো। বেঢপ সাইজের প্যান্ট কোমর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় খসে খসে পড়ছে। মাঝে মাঝে সেটা টেনে তুলতে তুলতে কথার মাঝখানে প্রাণখুলে হাসছে সে। তাতে ঝলমল করে উঠছে নাকের রুপালি রিং। তার রকম সকম দেখে ভদ্রলোক কৌতূহলী হলেন, পাগল বোধ হয়! পোশাক–পরিচ্ছদের যা ভাব। তার ওপর নিজের মনে কথা বলতে বলতে কেমন হাসছে দেখুন। মন্তব্য করা উচিত নয় জেনেও বহ্নি বলল, একা নয়, কারুর সঙ্গে কথা বলছে। ভদ্রলোক মুখে খাবার পুরেছিলেন। জবাব শুনে বিস্ময়ে হাঁ করে অপলক তাকালেন, কথা বলছে? কী করে? সেলফোন তো দেখছি না! মাইক্রো ব্লুটুথ ইয়ারপিসে কথা বলছে। সুচরিত তাড়া দিল, ‘বহ্নি, এবার আমাদের ডেপারচার গেটে যেতে হবে। আসি দাদা।’ বলেই সে উঠে দাঁড়াল। উত্তরে ভদ্রলোক শুকনো হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ আসুন। আমাদের অবশ্য প্লেন ছাড়বে সেই সন্ধ্যাবেলা। অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে!’

এয়ার ইন্ডিয়া এ ৭২৭-এর ডেপারচার গেট নম্বর এম ১০। ওরা এসেই দেখতে পেল ইলেকট্রিক বোর্ডগুলোতে অ্যারাইভাল, ডেপারচার ফ্লাইটের সংবাদ আপডেট করা হচ্ছে। দেখতে দেখতে আশ্বস্ত হলো সুচরিত, যাক অন টাইমেই ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু যাত্রীর সংখ্যা তো এখনো কম দেখছি! এসে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে। কাছেপিঠেই আছে সব। ডেপারচারের এখনো এক ঘণ্টা বাকি। হঠাৎ বহ্নির নজরে এল লুঙ্গির মতো ভাঁজ করে কমলা রঙের ধুতি পরা ফতুয়া গায়ের এক ভদ্রলোক পেছনে মুষ্টিবদ্ধ হাত রেখে অস্থির পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন চওড়া প্যাসেজটা দিয়ে। বহ্নি সুচরিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, আচ্ছা, ভদ্রলোক তখন থেকে ওভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছেন কেন বলো তো? মালকোঁচা মেরে এক্সারসাইজ করছেন। এরপর সারা রাত প্লেনে বসে থাকতে হবে কিনা। সুচরিতের গলায় কৌতুক ফুটল। বহ্নি হাসলেও মুখে বলল, মনে হচ্ছে, কোনো সমস্যা হয়েছে। সবাই কী রকম করে তাকাচ্ছে দেখ! সন্দেহ করে কেউ সিকিউরিটিতে যদি ফোন করে দেয়? দিলে দেবে!

কিছুক্ষণ পরেই একটি সতেরো–আঠারো বছরের ভারতীয় তরুণ হাস্যোজ্জ্বল মুখে গেটের দিকে এগিয়ে এল দ্রুত পায়ে। দেখেই দক্ষিণ ভারতীয় ভদ্রলোক থেমে পড়লেন হঠাৎ। যদিও মুখের বিপুল উদ্বেগের চাপা মেঘ পরিচ্ছন্ন হলো না সম্পূর্ণ। কাছে এসে উত্তেজিত তরুণ চারপাশ বিস্মৃত হয়ে ইংরেজিতে বলে উঠল, পাওয়া গেছে গ্রান্ডপা! পাওয়া গেছে। সিকিউরিটি চেকপয়েন্টের একটা বাস্কেটে ফেলে এসেছিলে! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ওটা এখনো কেউ ব্যবহার করেনি। বলেই একটি আমেরিকান পাসপোর্ট দাদুর হাতে ধরিয়ে দিল সে। জবাবে প্রবীণের মুখের ওপর স্বস্তির তরঙ্গ লুটোপুটি খেল। বুকপকেটে ঢুকিয়ে আনন্দ বিস্ময়ে উত্তাল হয়ে বললেন, ‘কিন্তু কী করে হলো? স্পষ্ট মনে আছে, সিকিউরিটি শেষ হওয়ার পরে পকেটেই রেখেছিলাম! কিন্তু রাখোনি যে, দেখতেই তো পাচ্ছ! এবার থেকে সতর্ক থাকবে। সে আর বলতে…।’

কাস্টমার সার্ভিস এজেন্টরা পরিচয়পত্রসহ টিকিটগুলো স্ক্যানিং করে ইলেকট্রনিক রেকর্ড রাখতে রাখতে একে একে যাত্রীদের বোর্ডিংপাস দিতে শুরু করেছেন। ভারতীয় প্যাসেঞ্জার বেশি থাকলেও ককেসিয়ানদের সংখ্যাও এখন নগণ্য নয়। হয়তো ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের গন্তব্যস্থান। দেখতে দেখতে যাত্রীবাহী এয়ার ইন্ডিয়া পূর্ণ হয়ে গেল কানায় কানায়। নির্দিষ্ট সময়ে ধাতব ডানা মেলে উড়াল দিল আকাশে। বিশাল কসমোপলিটন শিকাগো শহর কয়েক সেকেন্ডেই হারিয়ে গেল স্তরে স্তরে ঠেসে থাকা ঘন মেঘের আড়ালে। জেগে রইল শুধু সূর্যস্নাত নীল রঙের অবিকার সমুদ্র। অফুরন্ত, উন্মুক্ত, ভারহীন মহাকাশ।

গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতো এয়ার ইন্ডিয়া উড়ে চলেছে সাত ঘণ্টা ধরে। সামনের ঝুলন্ত টিভি স্ক্রিনে ভেসে রয়েছে তিনটি শব্দ। ‘Altitude 36000 Feet’. অর্থাৎ এখন ছত্রিশ হাজার ফুট ওপরে একটি ধাতব শরীরের মধ্যে মহাশূন্যের বুকে ভেসে রয়েছেন কয়েক শ যাত্রী। যেদিন দুই রাইট ব্রাদার, উইলবার ও অরভিল, মানুষের আকাশে ওড়ার স্বপ্নকে সফল করেছিলেন প্রথমবার, তখন কি ভেবেছিলেন বিজ্ঞান প্রযুক্তির নিরন্তর সাফল্য তাঁদের সাধনাকে এমন বিস্ময়কর স্থানে পৌঁছে দেবে একদিন? বিমানবালারা রাতের খাদ্য পরিবেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বাথরুমের দরজায় অপেক্ষা করতে করতে চোখে পড়ল বহ্নির। তার সামনেই এক ভারতীয় প্রবীণা। বাথরুমের অপেক্ষায় যার ধৈর্য ভাঙছিল ক্রমেই। হঠাৎ দৈত্যকার বিমানটা মহাশূন্যে দুলতে শুরু করল উন্মত্ত সাগরবক্ষে দুর্জয় ঢেউয়ের মতো। আটলান্টিক পেরোচ্ছে হয়তো। বহ্নির মুখের ভাবে বিরক্তি ফুটতেই ফিসফিস করলেন প্রবীণা, এ জন্যই আসতে চাই না। যখনই আসি, দাঁড়িয়ে থাকতে হয়! ওপাশের রেস্টরুমেও লম্বা লাইন। কিন্তু না এসেও তো উপায় নেই! ঠিক কথা। কয়েকজনকে দেখলাম, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাথরুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ওটাই অবিবেচকদের স্বভাব। কথা বলতে গিয়ে ক্ষুব্ধতা ছড়াল সহযাত্রীর কণ্ঠস্বরে।

অভিযোগ মিথ্যে নয়। পৃথিবীর সবখানেই স্বার্থপর অবিবেচকেরা অকারণে অজস্রবার অন্যের প্রয়োজন উপেক্ষা করে। ভদ্রমহিলা অন্য বাথরুমের অনুসন্ধানে ছুটলেন এরপরে। বহ্নির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল কেবল অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হওয়ায় নয়। দুলন্ত প্লেনে দুই পায়ে ব্যালান্স রেখে কষ্ট হচ্ছিল দাঁড়িয়ে থাকতে। বাইরে বেরিয়ে জরুরি দরকার ছাড়া সে এমনিতেও ওয়াশরুম ব্যবহার করা পছন্দ করে না। বিশেষত দীর্ঘ যাত্রার প্লেনে যেখানে নোংরা বাথরুমে পা রাখতেই গা ঘিনঘিন করে তার। তারপরেও জরুরি অবস্থায় পড়েই অপেক্ষা শেষে প্রবেশ করল সে। সঙ্গে সঙ্গেই ককপিট থেকে ঘোষিত হলো, ‘আমরা বাজে আবহাওয়ার মধ্যে পড়ে গিয়েছি। দ্রুত সিটবেল্ট পরে নিন। কোনোমতে দরজা খুলে বাইরে বেরোতে চোখে পড়ল, অপেক্ষারত কেউই নেই। এক কেবিন ক্রু কোনোমতে টাল সামলে পাশ দিয়ে সরে যেতে যেতে সভয়ে বললেন, ‘কী করছেন এখানে? নিজের আসনে ফিরে যান।’

মহাশূন্যের ব্যাপ্তিতে অসম্ভব অস্থিরতায় লাফাতে শুরু করেছে এয়ার ইন্ডিয়া এ-৭২৭। যেমন উড়ন্ত ঘুড়ি প্রবল বাতাসে বেসামাল হয়ে ওড়ে। সংকীর্ণ প্যাসেজ দিয়ে টালমাটাল অবস্থায় ফিরে আসতে আসতে প্রত্যেক পলকে ভয়ার্ত ব্যাকুলতায় তার মনে হতে লাগল, ধাতব পাখিটা বুঝি টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। আসনে উদ্বিগ্ন আকুলতায় অপেক্ষা করছিল সুচরিত। বহ্নি কাছে আসতেই বলল, ‘বাথরুম করে আসতে এত সময় লাগে?’ সময় লাগেনি। লম্বা লাইন ছিল। চলে এলেই পারতে। পরেও তো যাওয়া যেত। কথা বলার স্পৃহা নেই। প্লেনের ঝাঁকুনিতে বুকের অতলজুড়ে কাঁপছে বহ্নির। কম্পার্টমেন্টের শেষ সীমায় ঝুলে থাকা টিভিটাও কখন বন্ধ হয়ে গেছে। ভৌগোলিক সীমানা জানা যাচ্ছে না তাই। ডান পাশের আসনের ককেশাস মহিলার দিকে নজর গেল। চোখ বুজে বুকের ওপর আকুলভাবে ক্রস করছেন। ঠোঁট নড়ছে হাওয়ায় ওড়া শুকনো পাতার মতো। হয়তো নিঃশব্দ উচ্চারণে ত্রাণকর্তা যিশুর কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছেন বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য।

বিপৎসংকুল প্রতিটি দুর্ধর্ষ মুহূর্তকে দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছে যাত্রীদের। ভয়, প্রার্থনা, ব্যাকুলতা বহু অন্তরে মুখরিত হচ্ছে উত্তাল বক্ষ সমুদ্রের মতো। সুচরিতের পাশে যে সাদা ছেলেটি বসেছে, তার চেহারা দেখে অনুমান করার উপায় নেই, সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন তার মানসিকতা। কিন্তু এই শঙ্কিত মূর্ছনার মুহূর্তে সেই প্রত্যয়ই জন্মাচ্ছে তার আচরণ প্রত্যক্ষ করে। প্লেনের হালকা জলখাবার খেয়ে বহু সময় আপাদমস্তক কম্বলে ঢেকে সে ঘুমিয়েছিল। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে সেই নিমগ্ন নিদ্রা থেকে এবার সে উঠে বসল। আসনের পকেটে দলা পাকিয়ে রেখে দিল কম্বলটাকে। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে চটি খাতা বের করে তার ওপর এমন নিস্পৃহ ভঙ্গিতে আঁকিবুঁকি কাটতে লাগল, যেন তার বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছে।

ঝড় থামল চল্লিশ মিনিট ধ্বস্তাধ্বস্তির পরে। ফের জীবন চাঞ্চল্য ফিরে এল। বিমানবালারা মেন্যুর ক্যাটালগ ধরে সক্রিয় হলেন খাবার পরিবেশনে। ভেজিটেরিয়ান, ননভেজ, সি ফুড, মুসলিম, কোশের, হিন্দু, জৈন, ডায়াবেটিক, লো প্রোটিন, লো পিউরিন, লো সল্ট মিল ইত্যাদি খাবার পরিবেশিত হলো। বহ্নিদের তালিকায় এল বাসমতী চালের ভাত, নান রুটি এবং রোজমেরি পুদিনা পেস্ট দিয়ে চিংড়ি মাছের সঙ্গে অ্যাসপারাগাস সিদ্ধ। সঙ্গে চিজ কেক।

পাক্কা ১১ ঘণ্টা আকাশে উড়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে আপাতত এয়ার ইন্ডিয়া ৭২৭ দাঁড়িয়ে। সোয়া এক ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করবে। যাত্রীরা ক্যারি অন লাগেজ নিয়ে নেমে যাচ্ছেন একে একে। হাতমুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হতে পাসপোর্ট, বোর্ডিংপাসসহ নামতে গেল সুচরিত। হঠাৎ সিকিউরিটির দুজন পুরুষ পুলিশ অফিসার ছুটে এলেন এমনভাবে, যাতে বিব্রত হয়ে পড়লেন যাত্রীরা। জলদগম্ভীর কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন, যারা জার্মানির প্যাসেঞ্জার নন, তাদের বাইরে বেরোনো নিষেধ। না একদম উঠবেন না। বসে পড়ুন। বলেই সবাইকে বসিয়ে লাগেজ অনুসন্ধানের কাজে লেগে পড়লেন ত্বরিত গতিতে। কারণটাও সঙ্গে সঙ্গে বললেন, যেসব লাগেজের মালিক থাকবে না, সেগুলোকে নিয়ে যাব।

মিথ্যে বাগাড়ম্বরতা নয়। চলে যাওয়ার আগে মালিকহীন পাঁচটা লাগেজ নিয়ে তারা বেরিয়ে গেলেন। দ্বিতীয় দফায় যারা এলেন তারা নারী হলেও কঠোরতায় কর্কশ। আদেশের সুর ধ্বনিত হলো তাঁদের কণ্ঠেই বেশি, সবাই পাসপোর্ট আর বোর্ডিংপাস বের করুন। পুরো কম্পার্টমেন্ট দেখতে দশ মিনিটের বেশি সময় নিলেন না। এরই মধ্যে এক দক্ষিণ এশীয় নারী প্যাসেজজুড়ে দ্বিধাহীন পদচারণা করছিলেন। যেন সেটি উন্মুক্ত চরাচর। চাইলেই বিচরণ করা চলে। চোখে পড়তেই গর্জে উঠলেন একজন, ‘কেন এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? প্যাসেজটাকে ঘুরে বেড়াবার জায়গা বলে মনে হয়? যান, নিজের আসনে গিয়ে বসুন।’

ধমকের বহর দেখে অনেকেরই হৃদয়ঙ্গম হলো, এরা টিপিক্যাল জার্মান চরিত্রেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রচলিত নিয়মকানুন আর আইনের শিথিলতা কোনোভাবেই যারা বরদাশত করতে অভ্যস্ত নন। পুরোনো আর্য গরিমা এই শতাব্দীতেও যাদের মধ্যে অহংবোধে উজ্জীবিত। জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও যার সুস্পষ্ট প্রভাব। (চলবে)

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *